করোনা জাতীয়

অসচ্ছলরা ঘুরছে পথে, ত্রাণ তালিকায় বিত্তবান

করোনা মোকাবেলায় দরিদ্র অসহায়দের মাঝে ত্রাণ বিতরণের কথা থাকলেও করোনা-দুর্যোগের এ সময় সরকারি ত্রাণের তালিকায় স্থান পাচ্ছে না অসহায়-অসচ্ছলরা। তালিকায় উঠছে বিত্তবান, বাড়ির মালিক, রাজনৈতিক নেতা ও কাউন্সিলরের আত্মীয়-স্বজনের নাম। অসচ্ছল লোকজনকে ত্রাণ দেওয়ার জন্য তালিকা করার কথা বলে বারবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও পাসপোর্ট সাইজের ছবি নেওয়া হয়। কিন্তু ত্রাণ পায়নি তারা। ত্রাণের জন্য কাউন্সিলরের কাছে গেলে বের করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

সরেজমিনে ঘুরে ও লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। শুধু ওই ওয়ার্ডই নয়, এমন চিত্র ঢাকার দুই সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ত্রাণের আশায় রাজধানীর পথে পথে ঘুরছে অসহায় মানুষ।

বৃদ্ধা শেফালী বেগম ঢাকা উত্তর সিটির ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। সাত বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর শেফালীর আশ্রয় জোটে মেয়ের বাসায়। মেয়ের জামাই স্থানীয় বাজারে মাছ বিক্রি করেন। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে মাছের ব্যবসা বন্ধ। মেয়ের জামাই শেফালীকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন। এখন ভিক্ষাবৃত্তি করে আহার জোটাতে হচ্ছে তাঁকে।

ত্রাণের আশায় কাউন্সিলর সাজ্জাদ হোসেনের বাসায় গিয়েছিলেন। বারবার যাওয়ায় একসময় কাউন্সিলর গালাগাল করে তাঁকে বের করে দেন।

ত্রাণের আশায় পথে পথে ঘুরছেন নুরজাহান, সীমা বেগম, প্রতিবন্ধী শাহাদত, ভ্যানচালক মামুন আলমসহ অনেকেই। করোনার এ সময় নিম্ন আয়ের এসব মানুষ কাজ হারিয়ে দিশাহারা।

২ নম্বর ওয়ার্ডে খোলাবাজারে ন্যায্যমূল্যে পণ্য ক্রয় (ওএমএস) ও দীর্ঘমেয়াদে ত্রাণ বিতরণের জন্য করা তালিকায় নাম রয়েছে বেশ কয়েকজন বাড়িওয়ালার। ত্রাণের তালিকায় মৃদুল নামের একজনের নাম রয়েছে। যিনি মিরপুর-১২ নম্বর সেকশনের বি-ব্লকের ১০ নম্বর সড়কের একটি ছয়তলা ভবনের মালিক। ওই ভবনের নম্বর ১৫। এ ছাড়াও ১২ নম্বর সেকশনের ১২/সি সড়কের ১৬ নম্বর ভবনের মালিক রিপনের নাম রয়েছে ত্রাণের তালিকায়। ত্রাণের তালিকা ছাড়াও তাঁদের নাম রয়েছে খোলাবাজারে ন্যায্যমূলে পণ্য কেনার (ওএমএস) কার্ডের তালিকায়ও।

ত্রাণের তালিকা তৈরি করেছেন এমন একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, যাঁদের ওএমএস কার্ড দেওয়া হয়েছে তাঁদের একটি বড় অংশ ভবনের মালিক। আবার ওএমএস কার্ডধারী ৩৭০ জনের নামই ত্রাণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

ওএমএস কার্ডের তালিকায় রয়েছেন আতিকুর রহমান নামের এক ব্যবাসায়ী। পল্লবীর ২৫ নম্বর সড়কের ১১ নম্বর বাড়ির মালিক তিনি। দোতলা এ বাড়ির মালিক আতিকুর রহমান সম্পর্কে কাউন্সিলর সাজ্জাদ হোসেনের ভগ্নিপতি। ওই বাড়ির ছবি তোলার সময় বাসায় ছিলেন আতিক। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কথা বলতে রাজি হননি তিনি।

ওএমএস তালিকায় রয়েছে পল্লবীর ১২/৩ ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের দোতলা বাড়ির মালিক কামাল হোসেনের নাম। তিনি পল্লবী থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

জানা গেছে, রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ৩৭০টি স্বল্প ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে ওএমএস কার্ড দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো ওয়ার্ডে ডিলারদের মাধ্যমে ওএমএস কার্ডের পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে।

একটি সূত্র জানায়, উত্তর সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের কার্ডধারী ১৫০ জন পণ্য কেনেননি। কারণ ওএমএস কার্ডধারী ওই লোকেরা সবাই বিত্তবান। তাঁরা কেউ ১০ টাকা দামের চাল নিতে আগ্রহী নন। তবু রাজনৈতিক প্রভাব ও কাউন্সিলরের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তাঁদের কার্ড দেওয়া হয়েছে।

যদিও সরকারি ত্রাণ বিতরণ ও ত্রাণপ্রাপ্যদের তালিকা তৈরি ও দেখভাল করার জন্য প্রতি ওয়ার্ডে একটি কমিটি রয়েছে। ওই কমিটির আহ্বায়ক হলেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর। যুগ্ম আহ্বায়ক সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর, সদস্যসচিব হলেন ওয়ার্ড সচিব। এ ছাড়াও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সমাজের পাঁচজন গণমান্য ব্যক্তি কমিটিতে রয়েছেন। প্রতিটি ওয়ার্ডে এক্সেজ টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের দুইজন রয়েছেন। তাঁরা কমিটির কাছ থেকে পাওয়া তালিকা তথ্যভুক্ত করে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেন।

জানা গেছে, নিম্ন আয়ের ও অসচ্ছল মানুষের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। ওই সব তালিকাভুক্তকে সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘ মেয়াদে সহযোগিতা দেওয়া হবে। ঢাকার উত্তর সিটির ২ নম্বর ওয়ার্ডে এমন ৪০ হাজার লোকের তালিকা জমা পড়েছে।

তালিকা এত দীর্ঘ হওয়ার বিষয়ে কমিটির একাধিক সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, কাউন্সিলর তাঁর নিকটাত্মীয় ও রাজনৈতিকভাবে সম্পর্কের একাধিক বিত্তবানের নাম ঢুকিয়ে দেওয়ায় তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। কিন্তু বাদ পড়ে গেছে প্রকৃত অসহায় মানুষ।

ঢাকা উত্তর সিটির ২ নম্বর ওয়ার্ডের ওই কমিটির অন্যতম সদস্য অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাউন্সিলর আমাদের মাধ্যমে ত্রাণপ্রাপ্যদের তালিকা নেন। আমরা অসহায় মানুষগুলোর কাছ থেকে বারবার জাতীয় পরিচয়পত্রের কার্ড ও ছবি নিই। কিন্তু পরে দেখি সে নামগুলো তালিকায় নেই। তাঁরা কোনো ত্রাণও পাননি। কাউন্সিলর নিজের মতো করে তাঁর নিজস্ব লোকদের মাধ্যমে তালিকা করে জমা দেন।’

একই কমিটির আরেকজন সদস্য ইব্রাহিম হোসেন রুমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি নিজে কয়েকজন অসহায় ও প্রতিবন্ধীর তালিকা দিয়েছিলাম। কাউন্সিলর তাদের কোনো ত্রাণও দেননি, তালিকায়ও তাদের নাম নেই।’

কমিটির ওই দুই সদস্যই অভিযোগ করেন, বর্তমানে যে ত্রাণ কার্যক্রম চালু রয়েছে এটা প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে পরিচিত। অন্যান্য সব জায়গায় ত্রাণের প্যাকেটের গায়ে ‘প্রধানমন্ত্রীর উপহার’ লেখা থাকলেও ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সাজ্জাদ হোসেন প্যাকেটে থাকা প্রধানমন্ত্রীর উপহার লেখা কার্ড বাদ দিয়ে নিজের ভিজিটিং কার্ড লাগিয়ে ত্রাণ বিতরণ করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২ নম্বর ওয়ার্ডের একজন বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে বলেন, কমিটির অনেকেই ত্রাণ ভাগাভাগি করে নেন।’

করোনা শুরুর পর সরকার এ পর্যন্ত কয়েক দফায় ত্রাণ সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দফায় দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে পাওয়া ত্রাণ। এরপর দিয়েছেন এলাকার সংসদ সদস্য। তৃতীয় দফায় দেওয়া হয়েছে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে প্রাপ্ত ত্রাণ। বর্তমানে চলমান রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ‘উপহার’ ত্রাণ। ওই সব ত্রাণ বিতরণ হয় স্থানীয় কাউন্সিলরের মাধ্যমে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, ত্রাণ বিতরণের শুরু থেকেই কাউন্সিলর গত নির্বাচনে এলাকার যে সব লোক তাঁর নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন এবং নির্বাচনে তাঁর পক্ষে কাজ করেছেন তাঁদেরকে এবং তাঁদের মাধ্যমে একেকজনকে একাধিকবারও ত্রাণ দিয়েছেন। বাদ পড়েছেন সুবিধাবঞ্চিত ও অসচ্ছলরা।

২ নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সচিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর উপহার, সংসদ সদস্য, সিটি করপোরেশন ও সেনাবাহিনীর দেওয়া ত্রাণ মিলিয়ে ২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ১০ হাজার লোক ত্রাণ পেয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রে ত্রাণ দেওয়ায় তালিকা প্রাধান্য পায়নি, জরুরি ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তরের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সাজ্জাদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওএমএস কার্ড মাত্র ৩৭০টি। এলাকায় লোক প্রায় ৫০ হাজার। অনেক অসচ্ছল লোক বাদ পড়েছে এটা ঠিক। প্রথম দিকে যারা কাগজপত্র জমা দিয়েছে আমি তাদের তালিকা পাঠিয়েছি। তবে বিত্তবান, ভবনের মালিক কেউ তালিকায় আছেন কি না তা আমার স্মরণে নেই। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপহার আমি নিজের নামে দিইনি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা শফিউল আযম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি তালিকা যাচাই-বাছাই করি না। এর জন্য মাঠ পর্যায়ে কমিটি রয়েছে। আমি শুধু প্রাপ্ত তালিকা ওপরে পাঠিয়ে দিই। তবে বিত্তবান-ভবন মালিকরা কার্ড পেয়েছেন এমন অভিযোগ পেলে তা বাতিল করে দেব।’

ঢাকা-১৬ আসনের (পল্লবী-রূপনগর) সংসদ সদস্য ইলিয়াসউদ্দিন মোল্লা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অসচ্ছল অসহায় লোকদের বাদ দিয়ে বিত্তবান-ভবনের মালিক, নিকটাত্মীয়দের ত্রাণ দিয়েছেন এবং তাঁদের তালিকাভুক্ত করেছেন—এমন একাধিক অভিযোগ আমি পেয়েছি।’ সুত্র ঃ কালের কন্ঠ